|
| Photo- Collected |
দিন দিন কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ঘন ঘন মূত্রনালীর সংক্রমণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভাস এবং অতিরিক্ত ওজন কিডনি রোগের কারণগুলির মধ্যে অন্যতম। কিডনি সমস্যার কারণ যাই হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগের চিকিত্সার একমাত্র উপায় হ'ল সঠিক ডায়েট। কিডনি রোগীদের চিকিত্সা অন্যান্য রোগের চেয়ে বেশি যত্ন সহকারে নির্ধারণ করতে হয়। রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বৃদ্ধি কমাতে সঠিক ডায়েট অত্যন্ত কার্যকর। কিছু ক্ষেত্রে, সঠিক ডায়েট অনুসরণ করলে রক্ত ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা হ্রাস পায়। তবে রোগীর উপর নির্ভর করে কিডনি ডায়েট নির্ধারণে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কারণ ডায়েটে রক্তে ইলেক্ট্রোলাইটের পরিমাণ, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, ইউরিয়া এবং ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ, রক্ত এবং প্রস্রাবে অ্যালবামিনের পরিমাণ এবং ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা অনুসারে বাছাই করতে হয়। সেক্ষেত্রে কোনও ক্লিনিকাল ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া খুব জরুরি। তবে সাধারণত যে বিষয়গুলি মাথায় রাখা উচিত তা হ'ল:
১. ক্যালরি
কিডনি রোগীদের সাধারণত অন্যান্য রোগীদের তুলনায় বেশি পরিমাণে ক্যালোরির চাহিদা থাকে। ক্যালোরিগুলি পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ করে রোগীকে সঠিক পেশী ভর বজায় রাখতে সহায়তা করে। সাধারত প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য রোগী ভেদে ৩০ থেকে ৩৫ কিলোক্যালরি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এই ক্যালরি রোগীকে শক্তিপ্রদান করা ছাড়াও সক্রিয় এবং কর্মক্ষম রাখে।যা এই রোগের মোকাবেলায় রোগীকে প্রচুর পরিমাণে সহায়তা করে।
২. কার্বোহাইড্রেট
কিডনি রোগী মোট ক্যালোরি চাহিদার বেশির ভাগই কার্বোহাইড্রেটের মাধ্যমে পূরণ হয়। কার্বোহাইড্রেট কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে বন্ধুবৎসল। খাবারে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বলে কাবোর্হাইড্রেটকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে শর্করার মাত্রা বিবেচনা করে কার্বোহাইড্রেট হিসাব করা হয়।ভাত, আটা, রুটি, চিড়া, সুজি, চালের গুঁড়া, চালের রুটি, সাগো, সেমাই ইত্যাদি কিডনির রোগীদের জন্য কার্বোহাইড্রেটের ভালো উৎস।
৩. প্রোটিন
কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগে, প্রতি কেজি শরীরের ওজনে পয়েন্ট পাঁচ থেকে পয়েন্ট আট গ্রাম প্রোটিন বরাদ্দ করা যেতে পারে। তবে এই গণনাটি রোগীর অবস্থা এবং বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্টের উপর নির্ভর করবে।সাধারণত ডাল, বাদাম, কাঁঠালের বীজ, শিমের বীজ ইত্যাদি রোগীকে বাদ দিতে হবে। প্রতিদিনের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা ডিমের সাদা অংশ, মাছ, মুরগির মাংস ও দুধ বা দই ইত্যাদি থেকে হিসাব করে বরাদ্দ করা হয়। গরু, খাসির মাংস, কলিজা, মগজ ইত্যাদি অবশ্যই এড়িয়ে যেতে বলা হয়।
৪. চর্বি
বেশিরভাগ কিডনি রোগী উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। এ ছাড়া কিডনি রোগীদের যাতে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা , প্রেশার এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চর্বির হিসাব যথাযথভাবে করতে হবে। সাধারণত স্যাচুরেটেট বা সম্পৃক্ত চর্বি জাতীয় খাবার,ভাজা খাবার, ফাস্ট ফুড, ডিমের কুসুম এড়ানো উচিত। রান্নার তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদ্ভিজ্জ তেল, সূর্যমুখী, কর্ন অয়েল, ক্যানোলা অয়েল ইত্যাদি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।অনেক কিডনি রোগীকে ভয়ে তেল খাওয়া বন্ধ করতে দেখা যায়। যা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। প্রতিদিনের রান্নায় চার চা চামচ (20 মিলি) তেল ব্যবহার করা ভাল।
৫. সবজি
রক্তে পটাশিয়াম, ইউরিক এসিডের মাত্রা, ফসফরাস ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে সবজি হিসাব করা হয়। অতিরিক্ত পিউরিন ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ শাকসবজি, পিচ্ছিল ও গাড় লাল রঙের শাক সবজি এড়িয়ে যেতে হবে। তবে কিডনি রোগীদের জন্য চালকুমড়া, চিচিঙ্গা, ঝিংগা ইত্যাদি পানীয় সবজি উপকারী। উপকারী হলেও এগুলোর পরিমাণ মেনে চলাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা সবজির সালাদ, সবজি স্যুপ ইত্যাদি কিডনি রোগীদের এড়িয়ে চলতে হয়।
৬. ফল
কিডনি রোগীদের ফল খাওয়ার সময় খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। অক্সালিক অ্যাসিড, ইউরিক অ্যাসিড, পটাসিয়াম, রক্তচাপ এবং আরও অনেক কিছু বিবেচনা করে ফল নির্ধারণ করা হয়। তিন থেকে চারটি ফল রোগী ভেদে সীমিত পরিমাণে দেওয়া হয়। যেমন : আপেল, পাকা পেপে, পেয়ারা ইত্যাদি। অনেকই কিডনি রোগ হলে ফল খাওয়া বন্ধ করে দেয়। যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বিবেচনা করে ফল নির্ধারণ করতে হবে।
৭. লবণ
লবণ বা সোডিয়াম নিয়ন্ত্রিত পথ্য কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। রক্তচাপ, রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা, ইডিমা বা শরীরের পানির পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে লবণের পরিমাপ করা হয়। সাধারণত দুই থেকে পাঁচ গ্রাম লবণ নির্ধারণে করা হয় যা আপনার শারীরিক অবস্থা ও ডায়েটেশিয়ানের উপর নির্ভর করবে। তবে আলাদা লবণ পরিহার করা উচিত এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাবার অবশ্যই এড়ানো উচিত।যেমন: চিপস, পাপড়, চানাচুর, আচার ইত্যাদি যা কিডনি রোগীর চিকিৎসায় নয়, কিডনি রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে।
৮. তরল/ পানি
কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে তরল নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের চা, দুধ, জল সবই তরল হিসাবে গণনা করা হয়। একজন রোগীকে কত পরিমাণ তরল বরাদ্দ করা হবে তা নির্ভর করে রোগীর অবস্থার উপর। শরীরের ইডিমা, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, সোডিয়ামের মাত্রা, ইজিএসআর- এসবের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে এক থেকে দেড় লিটার, কখনো কখনো দুই লিটার পর্যন্ত তরল বরাদ্দ হয়। অনেকেই্ অসুস্থ কিডনিকে সুস্থ করার জন্য অতিরিক্ত জল পান করেন, যা ভুল।
দীর্ঘ মেয়াদি ক্রনিক কিডনি রোগীরা এ জাতীয় ডায়েট অনুসরণ করলে মারাত্মক জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। কিছুটা এক ঘেয়েমি হলেও ধৈর্যের সঙ্গে সঠিক ডায়েট মেনে চলা প্রত্যেক কিডনি রোগীর জন্য একান্ত জরুরি।
বিঃ দ্রঃ ডায়ালাইসিসের আগ পর্যন্ত রোগাক্রান্ত কিডনি সুরক্ষার জন্য এই খাবারগুলো মেনে চলা যায়।
Post a Comment